সদ্য সংবাদ
Home / জাতীয় / একুশের চেতনার গুরুত্ব এখন আরও বেশি

একুশের চেতনার গুরুত্ব এখন আরও বেশি

যেকোনো আনন্দ উৎসবের উন্মাদনাকে অনায়াসে ম্লান করে দিতে পারে একুশের মধ্যরাত। শহীদ মিনার অভিমুখে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়। জনপ্লাবন। বাচ্চা-বুড়ো সকলে। পাছে পেরিয়ে যায় প্রথম প্রহর। এক আবেগের বিস্ফোরণ। শহীদ মিনারের পথে খালি পায়ে এই দৌড়, সেই দৌড় না। এক অন্য দৌড়। সাদা-কালো জামা পায়জামা আর শাড়িতে। হাতে ফুল, গলায় একুশের গান। এটাই একুশের চেতনা।
সেই ছেলেবেলা থেকে বাবার মুখে শোনা একুশ। সযত্নে লালন করা একটি ছবি। মনের অ্যালবামে আজও উজ্জ্বল। অবশেষে তার সাক্ষী। শোনা আর দেখার মধ্যে মিল খুঁজেছি নিজের অজান্তেই। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে। এই রাতের ছবিই কি প্রকৃত বাংলাদেশ! যে বাংলাদেশের মানুষ ধার্মিক হতে পারেন, কিন্তু ধর্মান্ধ নন। এ কি জাদু না বাস্তব! নাকি পুরোটাই এক মায়াবী বিভ্রম! এটাই কি সেই ম্যাজিক রিয়ালিজম, জাদু বাস্তবতা। একটা দেশ মধ্যরাতে দৌড়াচ্ছে। হুইল চেয়ারে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা। ভাষা শহীদদের জানতে, ভাষার জন্য জানকবুল শপথ নিতে।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। মাতৃভাষার স্বীকৃতির দাবিতে পথে নামে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, মতিউর। রক্তে রাঙা রাজপথ। রক্তের দামে বাংলার স্বীকৃতি। রবীন্দ্রনাথকে অর্জন। একুশের সেই সিঁড়ি বেয়েই একাত্তর। মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতা।
একুশের আন্দোলনে একদিকে ছিল অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, অন্যদিকে এর মধ্যে ছিল শোষণের বিরুদ্ধে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। একুশের চেতনা থেকেই বাঙালির জাতীয় চেতনার উন্মেষ। পরিণতিতে একাত্তরে মহান সশস্ত্র সংগ্রাম। স্বাধীন বাংলাদেশ।
একুশের চেতনা এতই প্রবল ও ব্যাপক যে, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত দুর্গম অঞ্চলেও নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার। একুশের মধ্যরাত বা ভোরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক দেওয়া পরিণত হয়েছে একটা সাধারণ রীতিতে। যখন কোনো আদর্শ বা চেতনা গোটা জাতির অস্থিমজ্জার সঙ্গে মিশে যায়, তখন তার প্রকাশ রীতির রূপ ধারণ করতে পারে। একুশের অনুষ্ঠানকে তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতা মনে করলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতীয় চেতনা-বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা।
সে কারণে, শুধু ভাষার সংগ্রাম বা জাতীয় সংগ্রাম বললে একে রাজনৈতিক ভাষায় বুর্জোয়া বা পেটিবুর্জোয়া সংগ্রাম বলে চিহ্নিত করতে হয়। আসলে একুশের সংগ্রামের মধ্যে, একুশের চেতনার মধ্যে অনেক বেশি ছিল বামপন্থার উপাদান। একুশের সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন যারা তৈরি করেছিলেন, তাদের মধ্যে কমিউনিস্টরাই ছিলেন নেতৃত্বে। সে কারণে ভাষা আন্দোলনের ছিল না উর্দু বিদ্বেষ। এ ব্যাপারে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টি ছিল খুবই সচেতন। কমিউনিস্টরা আন্তর্জাতিকতাবাদী। আত্মগোপনকারী কমিউনিস্টরা সচেতন ছিলেন, যাতে এই আন্দোলন উগ্র জাতীয়তাবাদে রূপ না নেয়। এই ভাষা আন্দোলনের দাবি ছিল উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
ভাষার সঙ্গে আছে শ্রেণির সম্পর্ক। ভাষা আন্দোলনের আছে শ্রেণি বৈশিষ্ট্য। ভাষা আন্দোলনে সাড়া দিয়েছেন বাংলার কৃষক সমাজ। না হলে এই আন্দোলন এত জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারত না। ১৯৫৪ সালে হতো না মুসলিম লীগের ভরাডুবি। ভাষার দাবিতে শুরু হলেও প্রকৃতপক্ষে সেই আন্দোলন ছিল মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান সরকারের সামগ্রিক শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক মধ্যবিত্তের এক ব্যাপক আন্দোলন।
এখানেই শাহবাগ আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা। এখানেই একুশের শিক্ষা। একুশ মানে মাথা নত না করা। একুশ মানে অকুতোভয়। একুশ মানে প্রত্যয়। একুশ মানে স্পর্ধা। একুশ মানে শপথ। এসব কথা এতটাই বাস্তব, সংশয়ের লেশমাত্র নেই। সাধারণত দিনে এখানে যেমন মানববন্ধন, যাওয়ার পথে একবার নয়, রাস্তার দুধারে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে মানুষ। প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে। স্লোগানে-গানে। সংগঠিত নয় স্বতঃস্ফূর্ত।
ঘড়িতে ০০.০১। মিনারের পায়ের কাছে ফুলের স্তবক। সারা রাত ফুলে ফুলে ঢেকে যায় সব শহীদ মিনার। সকাল পর্যন্ত চলে মানুষের ঢল। দিনভরও সেই অফুরান স্রোত। অনেকেই সপরিবারে। কেউ একজন হয়তো বলছেন, একুশের লক্ষ্য কী, অর্জনের পথ কোন দিকে। একুশের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘বাঙালির অপরিসীম শক্তি এক হয়ে সেদিন এক অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। বায়ান্নর আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্র ক্ষমতাকে বিচূর্ণ করে জনগণ এক রূপান্তর চেয়েছিল। সমাজের বিপ্লবী চেতনা এক হয়ে রাষ্ট্রকে ভেঙেচুরে নতুন আদলে গড়ে তুলতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল রাষ্ট্রকে জনগণের মিত্র হিসেবে গড়ে তুলতে। তখন বাঙালির মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার স্ফুরণ ঘটেছিল, তা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরে আর থাকেনি। নেতৃত্ব চলে গিয়েছিল পুঁজিবাদীদের হাতে। যুদ্ধ শেষে চাপা পড়ে গিয়েছে সামাজিক বিপ্লবের স্বপ্ন। রাষ্ট্রের পুঁজিবাদী মনোভাবের কারণে তাই মাতৃভাষা চর্চা আজ ‘কোণঠাসা’ হয়ে পড়েছে।
জাতি হিসেবে আক্ষেপ, বাংলাকে আমরা এখনো জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এই অবস্থার মূলে রয়েছে আমাদের রাজনৈতিক সংকট। শ্রেণি বৈষম্যের অবসান না ঘটায়, সমাজে দারিদ্র্য, শোষণ ও নির্যাতন বাড়ছে ঔপনিবেশিক সমাজের মতোই। এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির যে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল, যে তাগিদ প্রয়োজন ছিল, তার অনুপস্থিতি সুদূর পরাহত করেছে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সাম্যবাদী সংকল্পের বাস্তবায়নকে।
স্বাধীন বাংলাদেশ পঞ্চাশের পথে। কিন্তু ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রের ছায়া এখনো নানাভাবে ক্রিয়াশীল। সাম্প্রদায়িকতা এখনো প্রকাশ্যে ও প্রচ্ছন্নভাবে রয়েছে নানা আকারে। খুন হচ্ছেন মুক্ত চিন্তার মানুষ, সংখ্যালঘু মানুষ। তাই এই সময়ে একুশের চেতনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। -প্রথম আলো

About bdlawnews

Check Also

থার্টিফার্স্ট নাইট ঘিরে রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার

ইংরেজি বছরের শেষ রাত থার্টিফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে অপ্রত্যাশিত বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোর লক্ষ্যে রাজধানীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by themekiller.com