সদ্য সংবাদ
Home / জেলা আদালত / ১১ আইনজীবীর মৃত্যু, করোনা আতঙ্ক চট্টগ্রামের আদালতপাড়ায়

১১ আইনজীবীর মৃত্যু, করোনা আতঙ্ক চট্টগ্রামের আদালতপাড়ায়

অনলাইনে ভার্চুয়াল আদালতে কার্যক্রম চলার পরও চট্টগ্রামের আদালতপাড়ায় ক্রমেই বাড়ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আইনজীবীর সংখ্যা। ইতিমধ্যে অন্তত ১১ জন আইনজীবীর মৃত্যু হয়েছে— যাদের বেশিরভাগই করোনা পজিটিভ হয়ে বা শ্বাসকষ্টের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।

আইনজীবীই শুধু নয়, আক্রান্ত হয়েছেন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরাও। ম্যাজিস্ট্রেট শিপলু কুমার দের পর চিকিৎসক স্ত্রীসহ আক্রান্ত হয়েছেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেম মোহাম্মদ নোমানও।

এদিকে চিফ জুডিশিয়াল আদালতের কোর্ট ইন্সপেক্টরসহ চট্টগ্রাম আদালতে কর্মরত পুলিশ ও কর্মচারীদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যাও দশের বেশি। আদালতপাড়ায় করোনা আতঙ্কে উপসর্গ থাকলেও অনেকে সেটি গোপন রাখতে চান বিড়ম্বনা এড়াতে। এতে বরং ঝুঁকি আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, করোনা পজিটিভ হয়ে ও লক্ষণ নিয়ে ইতিমধ্যে মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রাম আদালতের ১১ জন আইনজীবীর। এছাড়াও বিভিন্ন উপজেলায় থাকা চট্টগ্রাম বারের কয়েকজন প্রবীণ আইনজীবীও মারা গেছেন করোনার উপসর্গ নিয়ে। আবার বেশ কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী উপসর্গ নিয়ে বাসাতেই আইসোলেশনে রয়েছেন। অনেকের আবার উপসর্গ থাকলেও সেটি গোপন করছেন নানা কারণে।

মে ও জুন মাসে যেসব আইনজীবী মারা গেছেন, তারা হলেন— অ্যাডভোকেট কবির চৌধুরী, অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম, অ্যাডভোকেট ফজলুল করিম, অ্যাডভোকেট মাহবুবুল হক, অ্যাডভোকেট বিজন কুমার, অ্যাডভোকেট শেখ এস আই কামাল উদ্দিন চৌধুরী, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সঞ্চিতা সাহা, অ্যাডভোকেট মো. আবদুস সালাম, অ্যাডভোকেট মো. আবুল কাশেম চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সুচিত্র কুমার ঘোষ, অ্যাডভোকেট নুর উদ্দিন আহমদ, ট্যাক্সেস বারের সদস্য অ্যাডভোকেট কায়সার বেলাল। এদের কেউ করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, আবার কারও মধ্যে ছিল করোনার উপসর্গ।

তবে আদালতপাড়ায় করোনা ইতিমধ্যে হানা দিলেও আইনজীবীদের একটি পক্ষ বলেছেন, ভার্চুয়াল আদালতের কাজও যথেষ্ট স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ ও নিয়ম মেনেই চলছে। আদালতে আগের মত ভিড় নেই। নিয়ম অনুসারে কেবল জরুরি ফাইলিং ও জামিন শুনানি চলছে। আইনজীবীরা তেমন কোর্টেও আসেননি। তিন মাস ধরে ঘরে বন্দি থেকে ঈদের পর কেউ কেউ তাদের ব্যক্তিগত চেম্বারে বসছেন। আক্রান্ত হলেও কাজ ও জীবিকার তাগিদে আদালত চালু রাখার কথা বলেছেন তারা।

অপরদিকে আইনজীবীদের আরেকটি দল বলছেন, ঈদের পর আদালতে ঝুঁকি বেড়ে গেছে। আগে তো শুধু জামিন শুনানি হতো। এখন চেকের মামলার ফাইলিংও হচ্ছে। সিভিল মামলার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুনানি হচ্ছে। তাই আগের চাইতে এখন মক্কেলদের আনাগোনা বেশি। ঈদের আগেও যখন জামিন শুনানিতেও কোর্টে মক্কেলরা আসতেন। এমনকি কোন্ মামলা কোন্ দিন শুনানি হবে, কয়টা বাজে হবে, সিএমএম আদালতে যে লিস্ট লাগানো হয় সেটা দেখতেও আইনজীবী, মক্কেল, মুহুরিসহ অনেকজনের ভিড় হয়ে যায়। তাই স্বাস্থ্যবিধি মানতে চাইলেও পুরোপুরি সেটা রক্ষা করা সম্ভব নয়। সেভাবে নিরাপদও বলা যাচ্ছে না আদালত অঙ্গনকে।

জ্বর-কাশির মৃদু উপসর্গ নিয়ে বাসায় আইসোলেশনে রয়েছেন অ্যাডভোকেট প্রতাপ শীল। তিনি অনেকটা ক্ষোভের স্বরেই বললেন, ‘কিছু আইনজীবী আছে যাদের বোধ হয় চেম্বার না করলে পেটের ভাত হজম হয় না। দরকার ছাড়াও আসে। ভার্চুয়াল হিয়ারিংয়ে জনসমাগম হয়েছে। এটি যদি আরো একটু গোছানো হত আইনজীবীরা নিরাপদ থাকতেন। যদিও সমিতি অনেক ভাল পদক্ষেপ নিয়েছে। গতকাল আমার অসুস্থতার খবর শুনে সাইমুল স্যার ফোন করেছিলেন। আমি জ্বর বোধ করায় বাসায় আইসোলেশনে আছি। আমরা বেশ কয়েকজন সিনিয়রকে হারিয়েছি। এর মধ্যে কয়েকজনের যাওয়াটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’

এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট মনজুর আলম বলেন, ‘চাঁন্দগাওয়ের বাসিন্দা এক আইনজীবী সপরিবারে করোনার উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ রয়েছেন। বেশ কয়েকবার জেনারেল হাসপাতালে গিয়েও টেস্ট করতে পারেননি। শেষে বারের সেক্রেটারির হস্তক্ষেপে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে টেস্ট করেছেন। কিন্তু রিপোর্ট পেতে ৮ দিন লাগবে বলে জানানো হয়েছে। উনার ক্ষেত্রে মাসহ পজিটিভ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’

তিনি জানান, ‘আমার জানামতে কোর্টের ৭-৮ জন আইনজীবী পজিটিভ আছেন। সত্যি বলতে কী কোর্টে তেমন গ্যাদারিং নেই। আমাদের বার সেক্রেটারি যথেষ্ট ব্যবস্থা নিয়েছেন। তা না হলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তো।’

অ্যাডভোকেট রিগ্যান আচার্য্য বলেন, ‘আমি কিছুদিন ধরেই কোর্ট করছি না। ইতিমধ্যে ১১ জনের অধিক আইনজীবীর মৃত্যু হয়েছে। সেখানে অধিকাংশই করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। কেউ কেউ আগে থেকেই শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। আমাদের ট্যাক্সেস বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বেলাল ভাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘অনেকেই বর্তমানে চিকিৎসাধীন। আবার কেউ দেখছি উপসর্গ থাকলেও কিছু বলছে না। গোপন রাখছেন। আবার যারা টেস্ট করিয়েছেন তারাও রিপোর্টের অপেক্ষায়। বিভিন্ন কারণে আতংকও বেড়েছে আদালতপাড়ায়। যথেষ্ট প্রটেকশন নিয়ে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার পরও করোনা পজিটিভ হচ্ছেন বিচারকরাও।’

করোনা আক্রান্ত হলে গোপন রাখার প্রবণতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘করোনাকে সংক্রামকের চেয়ে মানুষ সামাজিক ব্যাধি বলেই মনে করছে। কেউ করোনা আক্রান্ত হয়েছে জানলে অন্যরা প্যানিক হয়ে যান। মারা গেলে কেউ জানাজায় যেতে চায় না—এ কারণেই হয়তো অনেকে গোপন করে। সামাজিকভাবে হেয় হবে ভেবেই সেটা গোপন রাখতে চায়।’

এ বিষয়ে এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট লায়লা নূর বলেন, ‘ভার্চুয়াল আদালতের কাজ করতেও ছুটতে হচ্ছে আদালতে। নামে ভার্চুয়াল হলেও বেশিরভাগ কাজ সরাসরিই করতে হয়। আর আদালতের মত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে চাইলেও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়। জনগণ নাকের ওপর একটা মাস্ক লাগানো ছাড়া আর কোন সাবধানতা জানে না। কয়েকদিন আগে বেশ কয়েকজন সিনিয়রদের হারালাম। যাদের অনেকেই করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গিয়েছেন। তবে তাদের কেউই এই লকডাউনের সময় আদালতে আসতেন না। এর মধ্যে কয়েকজন বিচারকও আক্রান্ত হয়েছেন। আসলে পেশাটা চ্যালেন্জিং। এখানে মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতন নেই। দীর্ঘ সময় এভাবে থেকে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়ায় আইনজীবীরা পড়েছেন কঠিন ধাঁধায়। জীবন আগে না জীবিকা আগে?’

তিনি বলেন, ‘এ সংক্রামক ঠেকাতে সামাজিক দূরত্বের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের অঞ্চলে এটাকে বুঝলো সামজিক বিচ্ছিন্নতা। কোভিডের কথা শুনলেই মানুষ মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অনেক অমানবিকতার কথা ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি। সামাজিকভাবে ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে অনেকে উপসর্গ থাকলেও বলছে না। অথচ তাদের এই না বলার কারণেও অন্যরা আক্রান্ত হচ্ছে।’

এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট জিয়া আহসান হাবীব বলেন, ‘আক্রান্তের বিষয়ে বললে আসলে আদালতেই আক্রান্ত হচ্ছে— সেটা বলা যায় না। আমি প্রতিদিন কোর্ট করি। মানবাধিকারের কাজ করি। প্রতিদিন বের হই । আমি তো আলহামদুলিল্লাহ ভাল আছি। অনেকে আবার ৩ মাস বাসা থেকে বের হচ্ছেন না। অথচ তারা পজিটিভ হলেন। আবার যারা মারা গেলেন তারা কিন্তু লকডাউনে কোর্ট আসেননি। তারা অন্যভাবে আক্রান্ত হয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘আসলে অর্থনীতির চাকা তো ঘুরতে হবে। অনেক আইনজীবী ঘরভাড়াও দিতে পারছে না। কারও তো আর জমিদারি নেই। তিন মাস বেকার বসে কিভাবে চলবে আইনজীবীরা? আদালতে শুধু জরুরি ফাইলিং হচ্ছে, জামিন শুনানি ও জরুরি শুনানিগুলো হচ্ছে। ধরুন কোর্ট বন্ধ। কিন্তু অপরাধ তো থেমে নেই। থানা মামলা নিচ্ছে না। জরুরি অবস্থায় মামলা দায়ের করতে তো কোর্টেই আসতে হচ্ছে। এছাড়া ফাইলিংয়ে শুধু আইনজীবী থাকলে চলে, সেখানে ভিড় হওয়ার কোন প্রশ্ন নেই।’

জিয়া আহসান হাবীব বলেন, ‘এখন পরিস্থিতি খারাপ। অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছে। আসলে করোনা তো আরও একবছর থাকবে কম করে। এর ভয়ে তো কাজ না করে বসে থাকা যাবে না। এছাড়াও আমরা বলতে পারছি না ভবিষ্যতে কারা আক্রান্ত হবে। করোনা মানেই তো মৃত্যু নয়। মানসিক সাহস রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজকর্ম স্বাভাবিক রাখাই উচিত।’ctg

About bdlawnews

Check Also

চুয়াডাঙ্গায় আইনজীবী ও কোর্টের স্টাফদের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হামলা ও ভাংচুর

চুয়াডাঙ্গায় আইনজীবী ও কোর্টের স্টাফদের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হামলা ও ভাংচুরের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Powered by themekiller.com