সদ্য সংবাদ
Home / Uncategorized / কামাল লোহানীর বর্নাঢ‌্য জীবন

কামাল লোহানীর বর্নাঢ‌্য জীবন

ইসমাইল হো‌সেন, সিরাজগঞ্জঃ একু‌শে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সাংবাদিক, ভাষা সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিক কামাল লোহানী করোনায় আক্রান্ত হয়ে শনিবার (২০ জুন) সকালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। মৃত্যুকালে তিনি রাজধানীর মহাখালীর শেখ রাসেল গ্যাষ্টোলিভার ইন্সষ্টিটিউট ও হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর আগে ১৭ জুন, ৮৬ বছর বয়সী লোহানী ফুসফুস ও কিডনি জটিলতা নিয়ে পান্থপথের হেলথ এন্ড হোম হাসাপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি হন। সেখানে নমুনা পরীক্ষা করে তার শরীরে করোনা উপস্থিতি সনাক্ত হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে শুক্রবার বিকেলে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। বরেণ্য এই ব্যক্তিত্ব ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার ছোনতলা গ্রামে প্রখ্যাত লোহানী পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার প্রকৃত নাম আবু নাইম মো: মোস্তফা কামাল খান লোহানী।

কামাল লোহানী এদেশের প্রতিটি সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন। দীর্ঘ জীবনের শুরুতে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহন করেন কোলকাতার শিশু বিদ্যাপিঠে। দেশ ভাগের পর ১৯৪৮ সালে চলে আসেন তদান্তিন পূর্ব বাংলায়। পাবনা জিলা স্কুল থেকেই যুক্ত হন ভাষা আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যয়নকালিন সময়ে পাবনায় নুরুল আমীনের আগমনের প্রতিবাদ করায় জীবনের প্রথম কারাবরণ। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে আবার গ্রেফতার।

জেল মুক্ত হয়েই ৫৪ সালে পাবনা থেকে সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন। পরে ঢাকায় বিভিন্ন সময় তার সাংবাদিকতার জীবনে দৈনিক আজাদ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক জনপদ, দৈনিক বাংলার বাণী,বঙ্গবার্তা, দৈনিক বার্তা সহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করেন। তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি এবং দুদফায় যুগ্ম সম্পাকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া একসময় তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নেরও সভাপতি ছিলেন।

ঢাকার বাইরে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দৈনিক র্বাতার সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন। করেন। ১৯৮১ সালে তিনি প্রেস ইন্সষ্টিটিউটের প্রকাশনা ও ডেপথনিউজ বাংলাদেশ এর সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৫৫ সালে ঢাকা এসে যুক্ত হন সাংস্কৃতিক অংগনে। প্রযোজনা করেন জি.এম. মান্নানের ‘নকশী কাথার মাঠ’ নৃত্যনাট্য। তিনি ছিলেন গণশিল্পী সংস্থার সভাপতি। ১৯৬২ সালে জেল থেকে মুক্তি লাভ করার পর ছায়ানট সংগঠনের প্রতিষ্ঠায় ভুমিকা রাখেন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে সরকারি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভুমিকা রাখেন। ১৯৬২ সালে পুন: গ্রেফতার হন। সে সময় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন আহমেদ, আবুল মনসুর আহমেদ, হায়দার আকবর খান রনো প্রমুখের সাথে একসাথে ছিলেন।

জেল খানায় জেল মুক্ত হয়ে একই বছর ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহন করেন। ১৯৬৭ সালে নিজ আস্থাশীল আদর্শে গড়ে তোলেন‘ক্রান্তি’। পাকিস্তান সাংস্কৃতিক দলের হয়ে মধ্যপ্রাচ্য সহ বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমন করেন।
রাজনীতিতে ন্যাপ (ভাষানী) রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। অংশগ্রহন করেন আয়ুব বিরোধী আন্দোলনে। উনসত্তরেরর গণঅভ্যুান্থানে পূর্ব বাংলার শিল্পীদের সাথে আন্দোলনে ভুমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকা বেতার পুর্নগঠনে ভুমিকা রাখেন। স্বাধীনদেশে তিনিবাংলাদেশ বেতারে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সাল ও ২০০৮ সালে তিনি শিল্প কলা একাডেমীর মহাপরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে ঢাকার তেজগাঁও বিমান বন্দর থেকে এবং বঙ্গবন্ধুর কোলকাতা সফর উপলক্ষে দমদম বিমান বন্দরের ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন কামাল লোহানী। তিনি উদীচি শিল্পী গোষ্ঠি, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এর উপদেষ্টা ছিলেন।

ব্যক্তি জীবনে শব্দ সৈনিক প্রয়াত দীপ্তি লোহানী ছিলেন তার সহধর্মীনি। এক পুত্র ও দুই কন্যার জনক কামাল লোহানী মুক্তিযুদ্ধ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, নৃত্য ও কবিতার ওপর এক ডজনের বেশি বইয়ের লেখক। ভাষা আন্দোলন,সাংবাদিকতা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড এবং মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের জন্য ২০১৫ সালে কামাল লোহানী সাংবাদিকতায় একুশে পদক লাভ করেন। কোলকাতা পুর সভার দ্বিশতবর্ষ সম্মাননা, বাংলাদেশ প্রেস ইন্সষ্টিটিউটমুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সন্মননা ও স্মারক, জাহানারা ইমাম পদক, ক্রান্তি স্মারক, খজিষ ও রাজশাহী লেখক সংঘ সন্মাননা ও স্মারকসহ বহু পুরস্কার ও পদকে ভুষিত হয়েছেন। প্রখ্যাত অভিনেতা প্রয়াত ফতেহ লোহানী ও সাংবাদিক, রাজনীতিক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব প্রয়াত ফজলে লোহানী ছিলেন মরহুমের চাচাতো ভাই।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায় প্রয়াত কামাল লোহানীকে উল্লাপাড়া গ্রামের বাড়ীতে পারিবারিক কবরস্থানে মায়ের কবরে সমাহিত করা হবে।

তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও দু:খ প্রকাশ করেছেন। শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, কামাল লোহানী বাঙালীর ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামে অগ্রণী ভুমিকা রেখেছেন। একজন আদর্শবান ও গুণী মানুষ হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সংস্কৃতি বিকাশের আন্দোলনে পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। শেখ হাসিনা বলেন আমরা একজন প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার অসাধারণ যোদ্ধাকে হারালাম। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

About bdlawnews

Check Also

বগুড়ায় নিজ পরিবারের সদস্যরাই ফরিদুল‌কে হত্যা করে, ভাবী সহ ৫ জন গ্রেফতার

বগুড়ায় সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জের ধরে সিমেন্ট ব্যবসায়ী ফরিদুল ইসলামকে (৪৮) কুপিয়ে হত্যা করেছে  নিজ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by themekiller.com