Home / কোর্ট প্রাঙ্গণ / শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা অনশনে কেন?

শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা অনশনে কেন?

রোকনুজ্জামান রোকন
সাবেক ছাত্রনেতা

”কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়’ কবির সুমনের গান এখন ”কতটা পথ পেরোলে তবে এদের আইনজীবী বলা যায়’ এভাবে গাইতে হবে! শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের বুঝতে হলে কবির সুমনের এই গানের প্যারোডি ছাড়া বোঝা মুশকিল এবং এই গান দিয়েই বুঝতে হবে!

অনেক পথ হেঁটেছে এরা। শিক্ষাজীবন শেষ ,তারপর স্বভাবতই আইনজীবী হিসেবে তালিকাভূক্তি পরীক্ষা। কিন্তু না পরীক্ষা নয় এবার অপেক্ষার পালা। বার কাউন্সিলের রেজিষ্ট্রেশন কার্ড হাতে পাওয়া, মামলায় কাজ করে দেখানো, ফরমপূরণ। এবার আবার অপেক্ষা তালিকাভূক্তির প্রিলিমিনারি পরীক্ষার জন্য। পূর্বের আইন অনুযায়ী ৬ মাসে একবার  পরীক্ষা নেওয়া কথা থাকলেও সর্বশেষ ২০১৭ সালের আপীলেট বিভাগের নির্দেশ অনুযায়ী প্রতি  ক্যালেন্ডার বছরে একবার পরীক্ষা নেবেন বাংরাদেশ বার কাউন্সিল’। অপেক্ষা ১ বছর নয় ৩ বছর তাও আবার আন্দোলন অতপর পরীক্ষা। যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে এ পরীক্ষায়। ভাববেন প্রহর গোনা শেষ! আদতে তা নয়। সামনে আরও দুটি পরীক্ষা, রিটেন এবং ভাইভা তারপর গেজেট প্রকাশ-সনদ পাওয়া অন্তর্ভূক্তি প্রাকটিশ শুরু। এবার ৪ বছর পর এসেছে লিপিয়ার আর ৩ বছর পর এদের ২৯ ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষায় পাশ। বার কাউন্সিল পরবর্তী ধাপের রুটিন দেবার আগেই মহামারী করোনার আবির্ভাব! তারা চোখ খুলে তাদের গাঢ়তম অন্ধকারময় ভবিষ্যৎ দেখে এবং চমকে উঠে অতপর আন্দোলনে নামে। তারা দাবি করে গেজেটের মাধ্যমে সনদ দিতে হবে। বার কাউন্সিলের দায়িত্বহীনতা ইতোপূর্বে তারা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। তাদের সাথে যুক্ত হয় ২০১৭ সালে প্রিলি পাশ করা আরো ৩হাজার ৫ শত শিক্ষানবীশ আইনজীবী। দেশে বিভিন্ন বারের আইনজীবীগণ দাবির সাথে সংহতি জানান। গত ৩০ জুন সারাদেশে মানববন্ধন, সমাবেশ ও স্মারকলিপি পেশ। কিন্তু এবিষয়ে বার কাউন্সিলের কোনরূপ কর্ণপাত না দেখে শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা সর্বশেষ গতকাল ০৭ জুলাই বার কাউন্সিল ভবন বোরাক টাওয়ারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি এবং সুপ্রীম কোর্টের বারান্দায় অনশন শুরু করে! এ হলো শিক্ষানবীদের অনশনে যাবার পটভূমি। অনেকেই ভাববেন এ মামা বাড়ির আবদার কিনা! না আবদার নয় সেটা পটভূমি থেকেই বুঝেছেন। এরা অনেক পথ হেটেছে, অনেক জঞ্জাল মাড়িয়েছে ,পথ চলতে গিয়ে বার বার হোঁচট খেয়েছে। কখনও শক্তিহীন অবস্থায় কিংবা শক্তি সঞ্চয় করে আবার হাঁটা শুরু করেছে। এই পাশ করতে গিয়েই ইতোমধ্যে জীবনের স্বর্ণময় অনেকটা অধ্যায় চলে গেছে। করোনা মহামারী তাদের সামনে মহামুদ্রসম অথৈ পথ বাতলেছে, যা পাড়ি দেবার আপাত কোন রাস্তা দেখছে না! বার কাউন্সিলের দায়িত্বহীনতার কারণে তাদের হাবুডুবু অবস্থা!
বার কাউন্সিলের কাজ কী? এক কথায় কাউন্সিলের প্রধান কাজ, ”আইনজীবীদের তালিকাভূক্তি এবং পেশাগত আচরণের শৃঙ্খলা রক্ষা ও এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া”। অথচ এই দায়িত্ব সে পালন করছে না ফলে দুর্ভোগ তৈরী হয়েছে। ফলে পাশকৃত ১২ হাজার শুধু নয় প্রায় ১ লাখের মতো শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা আজ মহা দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। কারণ সামনের ব্যাচ সনদ না পেলে তাদের এবং পরবর্তী ব্যাচের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ অনিশ্চিত। ফলে এ সমস্যা শুধু কয়েক জন পাশকৃতদের নয় গোটা আইনের শিক্ষার্থী যারা আইন পেশায় আসতে চায় তাদের। আর ভবিষ্যৎ আইনজীবীদের এ হাল হলে আইন ব্যবস্থা বড় রকম সংকট হয়ে দাঁড়াবে।
আপাত অর্থে গেজেট চাওয়াটা একটু অন্যরকম হলেও অবস্থাদৃষ্টে তাদের দাবির যৌক্তিকতা আছে। এমনত নয় যে, তারা পরীক্ষা দিতে চায় না! নিয়মিত পরীক্ষা হলে তারা দু বছর আগেই আইনজীবী হিসেবে আইন ব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারতো এবং যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারতো। মজার বিষয় হলো গেজেট মানে কোন সরকারি চাকুরি নয়! আইনজীবীদের তালিকাভূক্তি অর্থাৎ আইন পেশা পরিচালনার অমুমোদন। চাচ্ছে মাত্র তালিকাভূক্তি, অস্তিত্ব সংকটকালে অস্তিত্বের স্বীকৃতি।
হাইকোর্টের বারান্দায় তারা অনশনে বসে রাত্রীযাপন করছে তাদের এতটুকুন স্বীকৃতির জন্য। নিজের অবহেলার দায় শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের উপর না চাপিয়ে বার কাউন্সিলের উচিৎ হবে আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নেয়া। এবং এটা নিশ্চিৎ করা যে, আগামী বছর থেকে আপীল বিভাগের রায়ের নিদের্শনা অনুযায়ী তালিকাভূক্তির কাজ সম্পন্ন করা। প্রতি ক্যালেন্ডার বছরে একবার আইনজীবী অন্তর্ভূক্তির কাজ সম্পন্ন করলে আগামী সময়ে এরকম জটিলতর পরিস্থিতি তৈরীর সম্ভবনা কম। আবারও বলছি, আন্দোলনকারীরা পরীক্ষা দিতে চায় সেটা নিতে আপনারা চরমতম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন! দায় স্বীকার করে, এতোটা পথ হাটা পথিককে একটু জিরোতে দিন। ভুলে গেলে চলবে না এটা আপনাদের দায়িত্ব কোন অনুকম্পা নয়! আর এই জট নিরসনই পথনির্দেশ করবে আগামী দিনের আরো লক্ষাধিক শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের তালিকাভূক্তির জট নিরসনের রাস্তা।

লিখেছেন: রোকনুজ্জামান রোকন, সাবেক ছাত্র নেতা ও শিক্ষান‌বিশ আইনজীবী

About bdlawnews

Check Also

হ্যান্ড স্যানিটাইজারে সতর্কতামূলক নির্দেশনা যুক্ত করার নির্দেশ

হাতকে করোনা ভাইরাসমুক্ত রাখতে ব্যবহার করা হ্যান্ড স্যানিটাইজার, জীবাণুনাশক স্প্রে-সহ এরকম দ্রব্যের গায়ে দাহ্য পদার্থ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by themekiller.com