সদ্য সংবাদ
Home / দেশ ও দশ / রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘে ৪ প্রস্তাব দেবেন প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘে ৪ প্রস্তাব দেবেন প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সুনির্দিষ্ট চারটি প্রস্তাব দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি এই চার প্রস্তাব তুলে ধরবেন বিশ্বনেতাদের সামনে।

মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দফতরে ইসলামী দেশগুলোর সংগঠন ওআইসি এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: এ ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান।

এ সময় শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান খোঁজার তাগিদ দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গাদের অবশ্যই তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরে যেতে হবে।

অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ রোহিঙ্গা নিধনের বর্ণনা দিতে গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কুখ্যাত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে হত্যা এবং পরে কম্বোডিয়ায় গণহত্যার সঙ্গে এর তুলনা করেন।

তিনি বলেন, মিয়ানমার যখন এ সমস্যার সমাধানে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, তখন সমাধানের দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপরই বর্তাচ্ছে।

উচ্চপর্যায়ের এ বৈঠকে ওআইসির মহাসচিবসহ ইসলামী বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, বেলজিয়াম, সুইডেন, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন বৈঠকে।

শেখ হাসিনা তার বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, আরও একটি বছর পেরিয়ে গেল। অথচ রোহিঙ্গা সংকটের কোনো সমাধান পাওয়া গেল না- এটি হতাশাজনক।

বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছেন; যাদের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা এসেছেন ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে নতুন করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন শুরু হওয়ার পর। জাতিসংঘ ওই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযান হিসেবে বর্ণনা করে আসছে।

মিয়ানমার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ায় দুই দফা চেষ্টার পরও রোহিঙ্গাদের কাউকে তাদের ভিটেমাটিতে ফেরত পাঠানো যায়নি।

শেখ হাসিনা বলেন, মানবিক কারণে এই রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিল বাংলাদেশ। তাদের জন্য খাবার, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা বাংলাদেশ করে যাচ্ছে। নিজেদের দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা এই মানুষগুলোর মৌলিক চাহিদা পূরণে যা যা দরকার তা পূরণের চেষ্টা বাংলাদেশ অব্যাহত রাখবে।

‘আমি আবারও বলছি- রোহিঙ্গা সংকটের সৃষ্টি হয়েছে মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানে খুঁজে বের করতে হবে। মানবিক সহায়তা ও অন্যান্য সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনগুলো মেটানো গেলেও সংকটের অবসানে মিয়ানমারে এর একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি বলেন, শত শত বছর ধরে এই রোহিঙ্গারা যেখানে বসবাস করে আসছে, তাদের অবশ্যই সেখানে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকটকে একটি ‘রাজনৈতিক সমস্যা’ হিসেবে বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, এ সমস্যার মূল মিয়ানমারে গভীরে প্রেথিত। সুতরাং এ সংকটের সমাধান মিয়ানমারের ভেতরেই পাওয়া যাবে।

রোহিঙ্গাদের টেকসই, নিরাপদ ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।

‘এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চলমান কার্যক্রম অনুসরণ করছে। আমরা বিশ্বাস করি, এ বিষয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ওআইসি অ্যাড-হক মন্ত্রিপরিষদ গ্রুপের মাধ্যমে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’

রোহিঙ্গা সংকট বড় আকার ধারণ করার পর ২০১৭ সালে জাতিসংঘের ৭২তম সাধারণ অধিবেশনে এ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেছিলেন।

সেসব প্রস্তাবে কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলোর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন, রাখাইন রাজ্যে আলাদা ‘বেসামরিক পর্যবেক্ষক সেইফ জোন’ প্রতিষ্ঠার কথা ছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, এবার আমি নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উপস্থাপন করব।

১. রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন ও আত্মীকরণে মিয়ানমারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন দেখাতে হবে।

২. বৈষম্যমূলক আইন ও রীতি বিলোপ করে মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি করতে হবে এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের উত্তর রাখাইন সফরের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. রাখাইনে আন্তর্জাতিক বেসামরিক পর্যবেক্ষক রেখে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

৪. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবশ্যই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণগুলো বিবেচনায় নিতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য নৃশংসতার ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, রাখাইনে বহু রোহিঙ্গা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বিশ্ব যখন এটাকে অতীতের সেই কুখ্যাত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের সঙ্গে তুলনা করে, তখন মিয়ানমার তা অস্বীকার করে।

‘মিয়ানমার বলতে চায়, তারা সন্ত্রাসীদের হুমকি মোকাবেলায় অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সেখান থেকে লাখ লাখ আতঙ্কিত মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কারণে।’

মাহাথির বলেন, কক্সবাজারের ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের বসবাসের সময় যত দীর্ঘ হবে, তারা তত বেশি মরিয়া হয়ে উঠবে। আর মিয়ানমার এখনও রোহিঙ্গাদের ফেরার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। এ সমস্যার সমাধানে মিয়ানমার যদি আন্তরিক হয়ে থাকে, সেটা তাদের দেখাতে হবে।

এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া সরকারের অবস্থান তুলে ধরে মাহাথির বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে নিরাপদে, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদার সঙ্গে ফিরতে পারে, সেই প্রস্তুতি নিতে হবে আগে। আর রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি নাগরিকত্বের অধিকার দিলেই কেবল সেটি সম্ভব।

‘এটি স্পষ্ট যে মিয়ানমার সরকার সেখানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর নিপীড়ন-নির্যাতনে দায়ী ব্যক্তিরা যদি প্রশাসনযন্ত্রে সক্রিয় থাকে, তা হলে এ সংকটের সমাধান কীভাবে সম্ভব? ২০১৭ সালের কোনো ঘটনার বিচার হয়নি। এমনকি ইনদিন গ্রামের ঘটনায় মিয়ানমার যাদের দোষী সাব্যস্ত করেছিল, তাদের ১০ বছরের সাজা দেয়ার পর এক বছরের মাথায় মুক্তি দেয়া হয়েছে।’

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটি স্পষ্ট যে সংকটের সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে মিয়ানমার রাজি নয়। সুতরাং কিছু করার দায়িত্ব এখন আমাদের- আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর বর্তায়।’

আর সেই দায়িত্ব পালনের শুরুটা জাতিসংঘের মাধ্যমেই হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন মাহাথির মোহাম্মদ।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে কক্সবাজারের পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর যে প্রভাব পড়েছে, সে কথা তুলে ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ৮০০ একরের বেশি বনভূমিতে আশ্রয় নিয়েছে, যাতে বাস্তুসংস্থান ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।’

মানবিক সেবা ও সুরক্ষার সব ব্যবস্থা রেখে রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচরে আলাদা আবাসনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও তিনি বলেন।

অন্যদের মধ্যে ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল অব নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম অব বাংলাদেশের চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

পরে এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী বক্তারা রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন তারা।

‘১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ায় তারা বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন এবং প্রত্যেকে আশ্বাস দিয়েছেন যে তারা মিয়ানমারকে বলবেন তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে। আমি মনে করি এটা বাংলাদেশের জন্য একটি দুর্দান্ত অর্জন।’

পরে সৌদি আরব আয়োজিত একটি অধিবেশনে ওআইসির সদস্যভুক্ত বিভিন্ন দেশ জাতিসংঘের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে ২৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদিন নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। দুপুরে জাতিসংঘ সদর দফতরে জাতিসংঘ মহাসচিবের দেয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।

এ ছাড়া বিকালে জাতিসংঘ সদর দফতরে ‘লিডারশিপ ম্যাটারস- রিলেভেন্স ও অব মহাত্মা গান্ধী ইন দ্য কনটেমপোরারি ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া নৈশভোজে অংশ নেন।

About bdlawnews24

Check Also

করোনায় আরো ২৮ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ১০১৪

করোনাভাইরাসে দেশে ২৪ ঘণ্টায় আরো ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by themekiller.com