Home / দেশ ও দশ / শেরপুরে দুইটি ধর্ষণ ঘটনায় গ্রাম্য সালিশে বিচারের অভিযোগ

শেরপুরে দুইটি ধর্ষণ ঘটনায় গ্রাম্য সালিশে বিচারের অভিযোগ

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি ঃ বগুড়ার শেরপুরে আবারও দুইটি ধর্ষণের ঘটনা টাকার বিনিময়ে গ্রাম্য শালিসের মাধ্যমে ধামাচাপা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে গ্রাম্য মাতব্বরদের বিরুদ্ধে। শেরপুরের গ্রামাঞ্চলে ধর্ষণের শিকার হলে গ্রাম্য শালিসের মাধ্যমে টাউটরা দুই নারীর ইজ্জতের মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মাতব্বররা ধর্ষকদের কাছ থেকে নগদে জরিমানার টাকা আদায় করেছেন বলে জানা গেছে। এদের মাঝে শিবপুরের এক মাদ্রাসা ছাত্রীর (১৫) ঘরে ঢুকে জোর পূর্বক ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণের সাথে জড়িত অভিযুক্ত রামনগরের সাবিব্ব (২০) এর জরিমানা ৯০ হাজার টাকা ও গৃহবধূর ঘরে ঢুকে ধর্ষণে অভিযুক্ত ব্যক্তির ৮০ হাজার টাকা জরিমানা সহ জুতা-পেটার রায় কার্যকর করেন গ্রাম্য মাতব্বরা। শেরপুর উপজেলার গাড়ীদহ ইউনিয়নের বড়শিবপুর ও খামারকান্দি ইউনিয়নের ঝাজর গ্রামে এমন ধর্ষণের ঘটনা আইনে নিষেধ থাকলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি এবং সরকার দলীয় প্রভাবশালীরা জড়িত আছেন বলে এলাকায় প্রচার হচ্ছে।
এবিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবার,স্থানীয় এলাকাবাসী এবং গ্রাম্য মাতব্বরদের কাছে জানা যায়, গত ৪অক্টোবর মধ্যরাতে গাড়িদহ ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়ির পাশে বড়শিবপুর গ্রামে জনৈক মজিদের মেয়ে স্থানীয় শিবপুর দাখিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী প্রতিদিনের ন্যায় রাতে নিজ শয়নকক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। এরপর একই ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের আব্দুস সালামের বখাটে সাব্বির হাসান(২০) কৌশলে মাদ্রাসা ছাত্রীর শয়ন কক্ষে ঢুকে মুখবেঁধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। এসময় মাদ্রাসা ছাত্রীর চিৎকারে আশপাশের লোকজন এসে সাব্বিবরকে হাতেনাতে আটক করে। ওই ধর্ষণের ঘটনার পর ২নং গাড়িদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. দবিবুর রহমানের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় ধর্ষক সাব্বিরকে তারপর বিচারের আশ^াস দিয়ে সেখানে তাকে আটকে রাখা হয়। পরের দিন ওই চেয়ারম্যানের বাড়িতে মাদ্রাসা ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে গ্রাম্য সালিশি বৈঠক বসানো হয়। সেখানে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন সাব্বির। এরপর মোটা অঙ্কের টাকা জরিমানা নির্ধারণ করে সালিশের মাধ্যমে ঘটনাটি আপোষ-রফা করা হয়। টাকা আদান-প্রদানের পর আটকে রাখা ধর্ষক সাব্বিরকে ছেড়ে দেয়া হয়। সে সময় মাদ্রাসা ছাত্রীকে বিষয়টি কাউকে না বলার জন্য শাসানো হয়। সেইসাথে ধর্ষণের শিকার মাদ্রাসা ছাত্রীর পরিবারকে আইনের আশ্রয় নিতে বাধা এবং নানা রকম ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠে চেয়ারম্যান সহ গ্রাম্য মাতব্বর আব্দুস সালাম, মোমিন, বাচ্চু ও সাজল এর বিরুদ্ধে। কিন্ত অভিযুক্তরা তাদের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন। এদিকে ধর্ষণের ওই ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী ওই মাদ্রাসা ছাত্রীর বাবা আব্দুল মজিদ তার মেয়েকে ধর্ষণের বিষয়ে শালিস এবং জোর পূর্বক আপোষ রফা করার সত্যতা স্বীকার করলেও কোন অতিরিক্ত কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি। এদিকে শালিসি বৈঠকে উপস্থিত থাকা গ্রাম্য মাতব্বর আব্দুল মোমিন বলেন, চেয়ারম্যান সহ অন্যান্য গ্রাম্য মাতব্বররা বিচার করেছেন। সেই অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তির নিকট থেকে মাত্র ৬০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে মেয়ের বাবা মজিদকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি জড়িত নাই বলে দাবি করেন। এছাড়া আরও ৩০ হাজার টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়েছে। অপরদিকে ইউপি চেয়ারম্যান দবিবুর রহমান তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ওই ধর্ষণের ঘটনাটি আমার গ্রামের তাই আমি শুনেছি। আমি গ্রামে কোন বিচার-শালিস করি নাই। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। এছাড়া আর কিছু জানা নাই আমার।
অপরদিকে গত ১ অক্টোবর রাতে শেরপুর উপজেলার ৩নং খামারকান্দি ইউনিয়নের ঝাঝর গ্রামের দিনমজুর বেল্লাল হোসেনের বাড়িতে ঢুকে তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছে প্রতিবেশি আজিমুদ্দিনের ছেলে হেলাল উদ্দীন। এর পরেরদিন ঘটনাটি নিয়ে গ্রাম্য মাতব্বর সোলায়মান আলীর বাড়িতে শালিস বৈঠক বসানো হয়। সেখানে গ্রাম্য মাতব্বর সেলিম রেজা, ফারুক হোসেন, আজিজ ও টুনু মিয়া অভিযুক্ত ধর্ষককে মাত্র কয়েকটি জুতা-পেটা করেই শালিসের সমাপ্তি হয়। গ্রাম্য শালিসের বিচার মানতে নারাজ ওই গৃহবধূর স্বামী বেল্লাল হোসেন। এরপর গ্রাম্য মাতব্বররা আবারও ঘরোয়া ভাবে বসে এবং এই ধর্ষকের নিকট থেকে মাত্র ৮০হাজার টাকা জরিমানা নিয়ে ধর্ষিতার পরিবারকে দেয়ার কথা বলে ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়েছেন। শেরপুরের গ্রামাঞ্চলে এ ধরণের ধর্ষণের অপরাধ অহরহ ঘটছে। আর আইনে নিষেধ আপোষ যোগ্য নয় তার পরেও প্রভাব খাটিয়ে তা ধামাচাপা দিয়ে রাখা হচ্ছে। বগুড়া বারের সভাপতি আলহাজ এড. গোলাম ফারুক বলেন, আইনে স্পষ্ট বলা আছে ধর্ষণের ঘটনা আপোষ যোগ্য নয়।
বগুড়ার শিশু ও নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের এপিপি অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম মজনু বলেন, জনপ্রতিনিধি এবং গ্রাম্য মাতব্বররা ধর্ষণের বিচার করতে পারেন না। এমনকি এ ধরণের অপরাধ ধামাচাপা দেয়া আইন অনুযায়ী দন্ডণীয় অপরাধ। শেরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) এসএম আবুল কালাম আজাদ বলেন, ওই দুইটি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে বড়শিবপুর গ্রামে ধর্ষণের ঘটনার কথা আমি শুনেছি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া অন্য ঘটনাটি সম্পর্কে আমার জানা নাই।

About bdlawnews

Check Also

প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ে না দেয়ায় বাবাকে দায়ী করে আত্মহত্যা

প্রেমিক ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে না দিয়ে অন্যত্র বিয়ে দেয়ায় বাবাকে দায়ী করে চিরকুট লিখে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by themekiller.com