Home / কোর্ট প্রাঙ্গণ / হতাশায় নিমজ্জিত শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের দেখার কেউ নেই!

হতাশায় নিমজ্জিত শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের দেখার কেউ নেই!

করোনার ভয়াল থাবার ভয় উপেক্ষা করে জীবনের বাজি রেখে একখানা সনদের দাবীতে রাজধানী ঢাকার প্রেস ক্লাবের সামনে আমরণ অনশনে কাটছে শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের।

চলতি বছরের ৭ জুলাই তারা ঢাকার বার কাউন্সিলের সামনে অবস্থান কর্মসূচী শুরু করে ভুক্তভোগীরা। একই দিন বিকেলে আমরণ অনশণ শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে। পরবর্তীতে আবার বার কাউন্সিলের সামনে অনশন তারপর অদ্যাবধি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনশন অব্যাহত। এ অান্দোলন চলছে ১১২ দিন। অনশনকারীদের পরিবারের কোন সদস্যেরও ঘুম চোখে নেই। সন্তানের দূর্গম ইচ্ছা শক্তিকে বাস্তবে রূপ দিতে সন্তানকে পাঠিয়েছে ন্যায্য দাবী আদায় করতে। জীবন চলার পথে যখন কেউ অনিয়মে আর ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলে তখন এই অনিয়মের বেঁড়াজালকে ভেদ করে আসতে যত প্রকার বাঁধা বিপত্তি তা উপেক্ষা করেই আপন তুষ্টিতে বলিয়ান হতে চায়। ঠিক তেমনি শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা কতটা বেকায়দায় পড়ে গেলে জীবনের ঝুঁকিকে তোয়াক্কা না করে আজ রাজধানী ঢাকায় তাঁদের ন্যায্য অধিকার সনদের দাবীতে আমরণ অনশন করে?এটা আসলে অনেক বড় বেদনাদায়ক।

আমরা তরুন প্রজন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। কিন্তু এদেশের লাখো মানুষের আত্মত্যাগ আর বলিষ্ঠ ইচ্ছাশক্তির প্রবল জাগরণ তো ইতিহাসে পেয়েছি। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনেছি। সন্তানকে ভালবাসেনা এমন মা খুঁজে পাওয়া হয়তবা দূস্কর। একজন মা কখন তাঁর সন্তানকে ন্যায্য দাবী আদায়ের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধে পাঠায় বলতে পারেন? যখন সেই মা-বাবার নিজের সকল চেষ্টা অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখতে ব্যার্থ হয়। তখনি বলে যা বাবা তোকে আশির্বাদ করে দিচ্ছি তোর ন্যায্য দাবী আদায় করে বাড়িতে ফিরবি। তখন সেই সন্তান পিতা-মাতার আশির্বাদ হৃদয়ে লালন করে মহান সৃষ্টিকর্কার উপর ভরসা করে নেমে যায় ন্যায্য দাবী আদায়ের মাঠে।

বর্তমানে এমনি দাবী আদায়ের জন্য শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা ঢাকার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে আমরণ অনশনে করছে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের প্রধান কাজ হল আইনজীবী তালিকাভুক্ত করণ। The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972 এর বিধান মতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বছরে দুইটি আইনজীবী তালিকাভূক্তির পরীক্ষা নিবে। এমনটা বিধান থাকলেও তা সঠিকভাবে পালন হচ্ছে না।

২০১৭ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারী ” বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বনাম দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটি ” মামলার প্রদত্ত রায়ের নির্দেশনাতে আপিল বিভাগ বলেছিলো ” The Bar Council shall complete the enrollment process of the applicants to be enrolled as advocates in the district court each calendar year. ” কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আপিল বিভাগের এই নির্দেশনা দেওয়ার তিন বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর নির্দেশনাটি কার্যকর করা হয়নি।

উপরন্তু ২১ শে জুলাই ২০১৭ এর পর ২ বছর ৭ মাস পরে আরেকটি প্রিলিমিনারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। এতো দীর্ঘ সময় পরে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা পারিবারিক,সামাজিক, আর্থিক চাপের মধ্যে আছে, তারসঙ্গে বর্তমান করোনা পরিস্থিতির দরূন প্রিলিমিনারী পাশকৃতদের লিখিত পরীক্ষা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা হতাশায় ভুগছে।

এছাড়াও বর্তমান করোনা ভাইরাস মহামারীতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল ও আইনজীবীদের জন্য ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ এবং সহায়তা প্রদান করেনি। দীর্ঘ ৫ বছরে একটি মাত্র এনরোলমেন্ট পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ায় এবং বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা মানবেতর জীবনযাপন করছে।

ইতিপূর্বে সর্বশেষ এনরোলমেন্ট পরীক্ষাটি শেষ হতে সময় লেগেছিলো ১ বছর ৫ মাস। বর্তমান করোনা মহামারী কবে নিরসন হবে সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার করোনা ভবিষ্যত বাণীতে জানা যায়, এ সংক্রামন ব্যাধি পৃথিবীতে আরও ২/৩ বছর থাকবে। যার ফলে, প্রিলিমিনারী উত্তীর্ণদের
লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনিশ্চিত। বর্তমানে ২০১৭ ও ২০২০ সালের প্রিলিমিনারী পাশকৃত ১২ হাজার ৮৪৮ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য অপেক্ষায় আছেন। এছাড়াও ৫০ হাজারেরও বেশি শিক্ষানবিশ আইনজীবী পরবর্তী এমসিকিউ পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য অপেক্ষায় আছেন। এমন অবস্থায় যদি পরিস্থিতি বিবেচনা করে ২০১৭ ও ২০২০ সালে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা বাতিল করে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করা না হয় সেক্ষেত্রে আগামী ২০২১ সালেও বর্তমান এনরোলমেন্ট পরীক্ষার সম্পূর্ণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এর ফলে পরীক্ষার জট আরো দীর্ঘায়িত হবে এবং আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী ২০২১ সালে আরেকটি এনরোলমেন্ট পরীক্ষার প্রসেস সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না। এমন জটিলতায় শুধু যে শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা তা কিন্তু নয়।

তারা নিজে তো জ্বলছেই সাথে তাদের পরিবারও জ্বলছে। মহান পেশায় আসার ব্রত নিয়ে আদি সুনামের ধারাবাহিকতায় নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে কে না চায়। তাই সিলেকশন যদি হয় আইন পেশা। বর্তমানে আইন পেশায় আসতে অনেকেরই অনাগ্রহ। কারন বর্তমানে আইনে ডিগ্রি লাভ করে শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগ আইন পেশার সনদ পেতে দীর্ঘ জটিলতাকে ভয় পাচ্ছে। আইনে লেখাপড়া করে সব ছাত্র-ই তো জজ, ম্যাজিষ্ট্রেট কিংবা ব্যারিষ্ট্রার হতে পারবে না। কাজেই শিক্ষার্থীদের আইন বিষয়ে লেখাপড়া করানোর একটা মূল লক্ষ্য থাকে অবিভাবকদের যে- সন্তানকে আইনে পড়ায়ে জজ, ম্যাজিষ্ট্রেট কিংবা ব্যারিষ্ট্রার গড়ে তুলতে সর্বাত্বক চেষ্টা করবো। এসব টার্গেট যদি ফেইলও হয় সর্বশেষ মহান পেশা আইনজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে তো পারবো।

এত আইন শিক্ষার্থীর মধ্যে ক’জনেরই বা বাবা-মায়ের উচ্চাকাঙ্খা পূরণে সমর্থ হয়। আসলে সমর্থও সম্ভব নয়। বিচারক হতে হলে থাকে সীমিত পদ সংখ্যা আর ব্যাপক প্রতিযোগীতা ফলে একদম মেধাবীদের-ই স্থান হয়। ব্যারিষ্ট্রার হতে হলে চাই আর্থীক স্বচ্ছলতা ও মেধাবী। সেজন্যই আইনে ডিগ্রি নিয়েই আইনজীবী হওয়ার জন্য শুরু হয় সর্বশেষ মিশন। আর এই মিশনে বর্তমানে নানা জটিলতা আর অনিয়মে বছর বছর শিক্ষানবিশই কাটাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অনেক শিক্ষানবিশ আইনজীবীর ৩/৫ বছর কিংবা তারও বেশি অতিবাহিত হওয়ার পরও বার কাউন্সিলের পরীক্ষা পদ্ধতি, আইনী জটিলতা আর সঠিক সময়ে পরীক্ষা নেওয়ার স্বদিচ্ছা না থাকার কারনে হতে পারছে না আইনজীবী। এহেন সমস্যার কারনে আইনজীবী হতে না পারাটা যেমন শিক্ষার্থীর নিজের হতাশা তেমনি পরিবারেরও। ডিপ্রেশনে ভুগতে হয় শিক্ষার্থীর পুরো পরিবারকে। পাশের বাড়ির আইনে ডিগ্রী নেওয়া সন্তানটা যখন আইনে লেখাপড়া শিখে পড়ে গেছে মহাবিপদে তখন প্রতিবেশিরা কি আর জেনে-শুনে,বুঝে তার সন্তানটারে আইনে পড়াবে? নিশ্চয়-ই পড়াতে অনাগ্রহ প্রকাশ করবে।

আইন শিক্ষা গ্রহণ সমাজ তথা সচেতন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক। রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে নাগরিকদের জীবন-মান উন্নয়নে সচেষ্ট থাকবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রধান এটাই তো নিয়ম। কাজেই আইন অঙ্গনের সমস্যাগুলি কোথায় সেগুলি আইডেন্টিফাই করে সমাধান না করতে পারলে ধীরে ধীরে আইনের প্রতি আস্থাহীন ও আইন পেশার প্রতি অনাগ্রহ বেড়ে যাবে জনগনের।

আদালতপাড়ায় অনেকে মত প্রকাশ করেন- দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে আইন অঙ্গন পরিষ্কার রাখা জরুরী। শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের এমন একটা পরিস্থিতিতে আজ যেন আইনঙ্গনে পুরো ঘোলাটে ছাপ দেখা যাচ্ছে। শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের এমন অনিশ্চিত ভবিষ্যত দেখে অবিভাবকরা আজ নির্ঘুম। কোনো মতেই নিজেকে বুঝাতে পারছে না তাদের সন্তানের ভবিষ্যত পরিস্থিতির অদূর ভবিষ্যতে কি হবে। হয়তোবা কালো মেঘ দীর্ঘ সময় থাকবে না একদিন কালো মেঘের ছায়া কেটে গেলে এ অভাগা সন্তানরা হয়তোবা আলোর দিশা খুঁজে পাবে। কিন্তু এতগুলো বছর জীবন থেকে কালো অধ্যায় রচিত হয়ে থাকাটার কি হবে।

অনেক অবিভাবকে বলতে দেখেছি তার সন্তানকে বলছে বাবা আইনে পড়ায়ে তোকে ভূলেই করেছি যাক যা হওয়ার তো হয়েছে এখন অন্য কিছু কর। ফলে এ আইনের ছাত্ররা বাবা মায়ের মুখের দিক তাকায়ে চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়। এমন চলে যাওয়াটা যেমন ঐ সন্তানের কষ্টের তেমনি বিরাট ক্ষতি রাষ্ট্রেরও বটে। মেধাবী ছাত্রটা আর আইনজীবী হতে পারলো না। এমন পরিস্থিতি অনেক শিক্ষানবিশ আইনজীবী পরিবারে ঘটছে। অনেক বাবা মা সন্তানের এমন ভবিষ্যত দেখতে দেখতে চিন্তায় চিন্তায় হার্ড এ্যাটাক সহ নানা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করতেছে এ নজিরও আছে।

এখন শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের পরিবারের দাবী করোনা ক্রান্তিকালে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে শিক্ষিত বেকার কাজে লাগানোর জন্য বহুল সংখ্যক শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের মধ্যে যাঁরা ২০১৭ এবং ২০২০ সালের প্রিলিমিনারী পাশকৃত প্রায় ১৩ হাজার তাঁদের জন্য মানবিক দিক বিবেচনায় নিজ সন্তান মনে করে নিম্ন আদালতে প্রাকটিসের জন্য জরুরী গেজেট করে সনদ দিয়ে স্বনির্ভর করতে অবিভাবকরা আকুল আবেদন করছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বার কাউন্সিলের সম্মানিত সদস্যদের নিকট। অবিভাবকরা আরও বলেন-আমাদের সন্তানদের দাবী মেনে নিয়ে আমাদের একটু শান্তিতে ঘুমোতে দেন। আর কত নির্ঘুম থাকবো। একটু মানবিক হন আমার,আপনার সন্তানদের জন্য।

লেখকঃ মোঃ রায়হান আলী,শিক্ষানবিশ আইনজীবী ও কলামিস্ট, খুলনা।

About bdlawnews

Check Also

রিফাত হত্যা : মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামির হাইকোর্টে আপিল

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাত ফরাজীর করা আপিল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by themekiller.com