সদ্য সংবাদ
Home / রাজনীতি / রংপুর-৩ উপনির্বাচন : দুর্গ ধরে রাখতে মরিয়া জাপা

রংপুর-৩ উপনির্বাচন : দুর্গ ধরে রাখতে মরিয়া জাপা

এরশাদবিহীন প্রথম কোনো জাতীয় নির্বাচনে জয় পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। আগামী ৫ অক্টোবর রংপুর-৩ (সদর) আসনের উপনির্বাচনকে ঘিরে দলটির মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক তোড়জোড়। সমানতালে চলছে প্রচার-প্রচারণা। বৃষ্টিকে উপক্ষো করে প্রার্থীসহ দলীয় নেতাকর্মীরা ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে, দিচ্ছেন নানা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে দখলে থাকা এ আসনটিতে শেষ পর্যন্ত জাপার অবস্থা কী হয়-তা দেখতে অপেক্ষা আর মাত্র কয়েকটা দিনের।

জাতীয় পার্টির (জাপা) দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুর। বিগত সময়ের জাতীয় নির্বাচনে এর প্রমাণ মিললেও ১৯৯৬ সালের পর থেকে প্রতি সংসদীয় নির্বাচনে এ অঞ্চলে আসন হারিয়েছে দলটি।

২০১৬ সালে দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে জাপা মনোনীত প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দেয় প্রাণচাঞ্চল্য। তবে চলতি বছর দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জাপার ভরাডুবি হয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিভাগের বিভিন্ন পৌরসভা নির্বাচনেও সুবিধা করতে পারেনি দলটি।

বিগত সময়ের নির্বাচনী ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের বেশিরভাগই পেয়েছিল জাপা। সর্বশেষ ২০১৪ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে এ অঞ্চলে জাপার আসন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনের মধ্যে জাপা ১৭টি, আওয়ামী লীগ ৯টি, বিএনপি ১টি, সিপিবি ৩টি, জামায়াত ১টি, বাকশাল ও ন্যাপ ১টি করে আসন পেয়েছিল। সে বছর জাপা প্রার্থীদের জয়ে ভোটের ব্যবধানও ছিল অনেক। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে কিছুটা ভালো করেছিল জাপা। সে বছর তারা পায় ২১টি আসন। আর আওয়ামী লীগ ৮, বিএনপি ৩ ও জামায়াত ১টি আসন পায়। ৯৬ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আসন কম পেলেও সুবিধা করেছিল জাপা ও বিএনপি।

কিন্তু ১৯৯৬ এর নির্বাচনের পর থেকে এ অঞ্চলে জাপার ছন্দপতন ঘটে। আসনগুলোতে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করে নিজেদের আধিপত্য জানান দিতে থাকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত। যার প্রভাব পড়ে ২০০১ সালের নির্বাাচনে। ওই নির্বাচনে ২১টি থেকে কমে ১৪টি আসন পায় জাপা। আর আওয়ামী লীগ ৬টি, বিএনপি ৯টি ও জামায়াত পায় ৪টি আসন।

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে চার দলীয় ঐক্যজোটের বিপরীতে আওয়ামী লীগ-জাপার সমন্বয়ে গঠিত হয় মহাজোট। এতে বিএনপি-জামায়াত কোণঠাসা হলেও সুবিধা করতে পারেনি জাপা। নৌকার অবস্থান আরও মজবুত হয়, আসন হারায় লাঙ্গল।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগে জাতীয় পার্টি পায় ১৩টি আসন। আর আওয়ামী লীগ পায় ২০টি আসন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন আরও কমে যায়। ওই নির্বাচনে জাপার নির্বাচনী ইতিহাসে সবচেয়ে কম আসন পেয়েছে দলটি। নির্বাচনে মাত্র ৭টি আসন পায় জাপা। আর আওয়ামী লীগ ২৩টি, জাসদ ১টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ১টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী পায় ১টি আসন।

সর্বশেষ গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো ৭টি আসন পায় দলটি। এরমধ্যে রংপুরে ২টি, নীলফামারীতে ২টি, কুড়িগ্রামে ১টি, গাইবান্ধায় ১টি ও লালমনিরহাটে ১টি আসন পায় তারা। আর আওয়ামী লীগ পায় ২৪টি ও বিএনপি ১টি আসন। তবে জাতীয় পার্টি মহাজোট ছাড়া এককভাবে কোনো আসনে জয়লাভ করতে পারেনি।

অপরদিকে বিএনপি ১টি আসন পেলেও আওয়ামী লীগের বিজয়ী প্রার্থীদের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন তারাই।

এদিকে গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অধিকাংশ জায়গায় প্রার্থীই দিতে পারেনি জাপা। রংপুরের ৮ উপজেলার মধ্যে শুধু পীরগাছায় জাপা নিজেদের ইমেজ ধরে রাখতে সক্ষম হয়। বাকি ৭ উপজেলায়ই দলটির অবস্থা শোচনীয়। এর মধ্যে গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, মিঠাপকুর ও কাউনিয়া উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে নিজেদের কোনো প্রার্থীই দিতে পারেনি দলটি। এছাড়া বিভাগের অন্য উপজেলাগুলোর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটিতে লাঙল প্রতীকের প্রার্থী থাকলেও কেবল দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে পেয়েছে তারা।

জাপার প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের পৈতৃক নিবাস রংপুরে। ক্ষমতা হারানোর পরও রংপুর অঞ্চল দলটির দুর্গ হয়েই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনে একের পর এক ভরাডুবি হয়েছে দলটির।

এর ব্যত্যয় ঘটেনি ইউপি ও পৌরসভা নির্বাচনেও। চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে ধরাশায়ী হয়েছেন জাপার প্রার্থীরা।

রংপুর-৩ (সদর) আসনটি দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে দখলে ছিল জাপার। গত ১৪ জুলাই দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর শূন্য ঘোষণা করা হয় আসনটি। আগামী ৫ অক্টোবর ইভিএম পদ্ধতিতে এ আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

জাপার প্রার্থী এরশাদ পুত্র রাহগির আলমাহি সাদ এরশাদসহ ৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবারের নির্বাচনে। এরমধ্যে আলোচনায় রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী জাপার সাবেক এমপি হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ (এরশাদের ভাইপো) এবং বিএনপির রিটা রহমান।

নির্বাচনী বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খোদ পরিবারের মাঝে বিরোধ এবং মহাজোটের অন্যতম শরীক আওয়ামী লীগ নির্ভর হয়ে ওঠা জাপার সামনে এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই।

মূলতঃ এক পরিবার থেকে আসিফ শাহরিয়ারের প্রার্থী হওয়া ও স্থানীয় জাপার একটি অংশ বিপক্ষে থাকাসহ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভোট বর্জনের ঘোষণা জাপা প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

সেই সঙ্গে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রিটা রহমান। গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রয়াত এরশাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৫৩ হাজার ভোট পেয়েছিলেন তিনি। এবার এরশাদ নেই, সেই সঙ্গে জাপার বিভেদকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটতে চাইছে বিএনপি।

জাপার একাধিক কর্মী-সমর্থক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দলের পক্ষ থেকে যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিয়ে বিভিন্ন নির্বাচনে অযোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ায় নিজ ঘাঁটিতে শোচনীয় অবস্থা জাপার। এ রকম চলতে থাকলে নিজেদের ঘাঁটি বলে পরিচিত রংপুরে চিরতরে প্রভাব হারাবে জাপা।

এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে সামনের উপনির্বাচনে জাপা কতটা সফল হতে পারবে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জেলার সাধারণ সম্পাদক এসএম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর বলেন, জাতীয় পার্টির মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। দুই-একজন হয়তো নির্বাচনী কাজ করছেন না, এতে অসুবিধা হবার কথা নয়।

তিনি আরও বলেন, মহাজোটের শরীক হিসেবে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের কার্যক্রম দৃশ্যমান না হলেও মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে সাদ এরশাদের পক্ষেই তারা কাজ করছেন।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি, জয়ের ব্যাপারে আমরা শতভাগ আশাবাদী।

About bdlawnews24

Check Also

ভাস্কর্যের সমাধান এক সপ্তাহের মধ্যে: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণে হেফাজতে ইসলামের নেতাদের বিরোধিতায় সৃষ্ট পরিস্থিতির অবসানের আশ্বাস দিয়েছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by themekiller.com